mission71

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খান। বলিউড কিং খানের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক তথ্য জানার জন্য গভীর আগ্রহ থাকে দর্শকদের। কিন্তু এই সুপারস্টারকে কেন মেয়েরা বেশি পছন্দ করেন? এ প্রশ্নের উত্তর জানা গেছে, শ্রায়ানা ভট্টাচারিয়ার লেখা একটি বইয়ে।

বইটির লেখিকা শ্রায়ানা ভট্টাচারিয়া শাহরুখ সম্পর্কে তার ডজন ডজন নারী ফ্যানকে এই প্রশ্ন করে প্রায় একই উত্তর পেয়েছেন। তবে অবাক হলেও এটা সত্যি যে অনেক নারীর শাহরুখ প্রেমের সঙ্গে তাদের আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের যোগসূত্র রয়েছে।

শ্রায়ানা ভট্টাচারিয়া বলেন, ‘কখন, কিভাবে এবং কেন তারা শাহরুখকে পছন্দ করা শুরু করল, তার উত্তর দিতে গিয়ে এসব নারী নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে কখন, কিভাবে এবং কেন তাদের হৃদয় ভেঙেছে সে কথা বলেছেন। তাদের স্বপ্ন, উদ্বেগ, তাদের প্রেম এবং সঙ্গী পছন্দ নিয়ে নারীদের যে নিরন্তর লড়াই, যন্ত্রণা তার সঙ্গে যেন কোথাও তাদের শাহরুখ প্রীতির যোগসূত্র রয়েছে।’

শ্রায়ানা ভট্টাচারিয়া হঠাৎ করে কোনো সমীক্ষা চালাননি। প্রায় ২০ বছর ধরে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা নিয়ে উত্তর ভারতের বহু নারীর সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতা থেকে লেখক এসব উত্তর পেয়েছেন।

এসব নারীর মধ্যে বিবাহিত, অবিবাহিত, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান- সব ধরনের মানুষ আছেন। তাদের অনেকে পরিবারে সুখী অনেকে অসুখী, অতৃপ্ত। তাদের মধ্যে অনেক শ্রমজীবী নারীও রয়েছেন। একটি বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল, তারা সবাই শাহরুখ খানের ফ্যান।

আমাদের জীবনে শাহরুখ খানের সরব প্রবেশ ১৯৯০ এর দশকে। একই সময়ে ভারতে কোকা-কোলা, কেবল টিভির আগমন। ভারতে নতুন এক ‘উদার অর্থর্নীতির’ সূচনা তখন।

লেখক বলেন, আমি সেই সময়ের নারীদের গল্প বলতে চেয়েছি এবং আমি দেখলাম খান কীভাবে অজান্তে ওই নারীদের মিত্র হয়ে হাজির হয়েছিলেন।

২০০৬ সালে পশ্চিম ভারতের একটি বস্তিতে আগরবাতি তৈরির কারখানার নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এই লেখক। মজুরি নিয়ে তারা খুবই ক্ষুব্ধ-হতাশ ছিলেন। কাজের বিরতির সময় ওই নারী শ্রমিকদের সঙ্গে তিনি কথা শুরু করেন। জিজ্ঞেস করেন, কোন বলিউড নায়ক তাদের সবচেয়ে প্রিয়। তারা সোৎসাহে বলতে শুরু করেন কি কি বিষয় তাদের আনন্দ দেয় এবং তার অন্যতম ছিল শাহরুখ খান।

তার পরের সমস্ত এই ধরনের সমীক্ষায় শ্রায়ানা দেখতে পেয়েছেন, শাহরুখ খানের ফ্যান এই নারীদের প্রায় সবাই শ্রমবাজারে তাদের বৈষম্যের শিকার। সেই সঙ্গে ঘরে-পরিবারে তাদের সবাইকেই কমবেশি লড়াই করতে হয়। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত যেসব নারী শাহরুখের ফ্যান তাদের মুখেও একই কথা শুনেছেন লেখক।

সাধারণ একটি আক্ষেপ এই নারীরা করেছেন, ‘কেন আরও বেশি পুরুষ শাহরুখের মতো হয় না!’

লেখিকা বলেন, এই নারীরাই তাকে তারকা বানিয়েছেন। আর তার পেছনে ছিল তাদের নিজেদের নিত্যদিনের বাস্তবতা, তাদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, হতাশা। পর্দায় নায়িকার প্রতি খানের শতভাগ নিষ্ঠা, মনোযোগ নারীদের আকর্ষণ করে।

তার অনেক চরিত্রে তিনি যেভাবে সম্পর্কের পরিণতি, অনিশ্চয়তা নিয়ে তার উদ্বেগ দেখিয়েছেন, তাতে আকৃষ্ট হয়েছেন নারীরা। কারণ তাদের নিজেদের জীবন নিয়েও তারা সবসময় অনিশ্চয়তায় ভোগেন ।

পর্দায় আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে শাহরুখ যেভাবে অনেক সময় বেসামাল হয়ে হুহু করে কাঁদেন, যেটা বলিউডে বেশ বিরল, তা পছন্দ করেন নারীরা। কারণ তারা দেখেন শাহরুখ তার আবেগ প্রকাশ করতে, নারীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে লজ্জা পান না।

এক নারী পোশাক শ্রমিক বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি কাভি খুশি কাভি গাম ছবিতে শাহরুখ যেভাবে কাজলের সঙ্গে কথা বলেছে, তাকে স্পর্শ করেছে আমার সঙ্গে কোনো পুরুষ যদি তেমন করতো! কিন্তু আমার স্বামী এতই রুক্ষ।

ধনী, অভিজাত পরিবারের অসুখী বিবাহিতা এক নারী জানান, তিনি তার ছেলেদের ‘ভালো মানুষ ‘ হিসেবে বড় করতে চান। তার কাছে ভালো মানুষের সংজ্ঞা, তারা যেন কাঁদতে পারে, শাহরুখ যেমন আমাদের মধ্যে যে ভরসা এবং ভালোবাসার বোধ তৈরি করে, তার ছেলেরাও যেন তাদের স্ত্রীদের মনে একই অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

পর্দায় তিনি মেয়েদের বিরক্ত করছেন বা সহিংস আচরণ করছেন, শাহরুখ খানের এসব চরিত্র নিয়ে এসব নারীরা স্বস্তি পান না। ফ্যান হলেও খানকে যে তারা এ ধরনের চরিত্রে দেখতে চান না। এমন নয় যে তারা গ্ল্যামার-নাটক উপভোগ করেন না, কিন্তু পর্দায় খানের ছোট ছোট জিনিস তাদের অনেক বেশি আকর্ষণ করে।

‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে‘ ছবিটি শাহরুখ খানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলার অন্যতম। এটি সম্ভবত বলিউডের সবচেয়ে সফল রোমান্টিক চলচ্চিত্র।

ওই ছবি সম্পর্কে শাহরুখের এক তরুণী ফ্যানের মা আমাকে যে কথা বলেন তা আমি কখনও ভাবিনি, লক্ষ্যও করিনি, ‘আমি প্রথমবারের মতো ওই ছবিতে দেখলাম নায়ক ছুরি দিয়ে গাজর ছিলছে। পরিবারের নারীদের সঙ্গে নায়কের এত হৈচৈ, এত সময় কাটানোর ব্যাপার আমি আগে কোনো সিনেমায় দেখিনি।’ ওই নারীর মতে, এই ব্যাপারটি ছিল অসামান্য রোমান্টিক।

নারী ফ্যানরা যে শাহরুখের প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ বোধ করেন না তা নয়। সে কথা তারা প্রকাশও করেছেন। কিন্তু সেটি ছাড়াও তাকে পছন্দের কারণ হিসাবে ওই নারীরা আরও অনেক কিছু বলেছেন।

 

প্রতিদিনের অবিচার, লড়াই এবং হৃদয় ভাঙার বেদনার মধ্যে খান অনেক নারীর জন্য এক ধরনের স্বস্তি, উপশম। তার মতো একজনকে নারীরা যে বিয়ে করতে চাইতেন তার কারণ এই নয় যে তিনি একজন বলিউড তারকা। তার প্রধান কারণ বরঞ্চ তিনি একজন ‘সহানুভূতিশীল বিবেচক‘ পুরুষ।

একজন বিবেচক পুরুষ নারীকে কাজ করার সুযোগ দেয়, টাকা জমানোর সুযোগ দেয়। অন্তত স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করলেও তা পায়ে দলে দেয় না। এ কারণে তারা শাহরুখের ছবি দেখতে সিনেমা হলে গিয়ে হামলে পড়েছেন। শ্রায়ানার বইতে এমন এক সরকারি কর্মকর্তার ভাষ্য রয়েছে, যিনি তরুণী বয়সে লুকিয়ে শাহরুখের ছবি দেখেতে গিয়ে মায়ের হাতে মার খেয়েছিলেন। এক পোশাক শ্রমিকের কথা রয়েছে, যাকে লুকিয়ে শাহরুখের ছবি দেখার জন্য ছোট ভাইদের মুখ বন্ধ রাখতে উৎকোচ দিতে হয়েছে। এক গৃহকর্মীর কথা রয়েছে, যিনি রোববারের গির্জায় প্রার্থনা বাদ দিয়ে টিভিতে শাহরুখের ছাবি দেখার জন্য পাদ্রির কাছে মিথ্যা অজুহাত দিয়েছেন।

লেখিকা বলেন, ‘যখন কোনো নারী বলে যে একজন অভিনেতাকে পছন্দ করে, সে আসলে বলতে চায় ওই অভিনেতার চেহারা, ব্যক্তিত্ব সে পছন্দ করে।’ তিনি লিখেছেন, এসব নারীরা হয়ত খুব বেপরোয়া বা সাহসী নয়, কিন্তু এ ধরনের পছন্দ প্রকাশ করে তারা তৃপ্তি পায়, তাদের কাছে এটা এক ধরনের বিদ্রোহ। বিছানার নীচে পছন্দের নায়কের পোস্টার রেখে দেয় তারা। পর্দায় তার গাওয়া গান শোনে, সেই গানের সঙ্গে তারা নাচে। তার ছবি দেখে তারা বোধ করে কোন ধরনের জীবন তারা চায় বা চেয়েছিল।

যেমন, যে সরকারি চাকরির কথা বইতে আছে, তিনি এক সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি এমন এক জীবন তৈরি করবেন যেখানে শাহরুখ খানের ছবি দেখতে কারও কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে না।

একজন নারী বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন কারণ চুরি করে খানের ছবি দেখতে যাওয়ার কারণে তার পরিবার তড়িঘড়ি করে এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছিল যে ছেলে শাহরুখ খানকে পছন্দ করে না। ওই নারী এখন একজন বিমানবালা এবং এমন একজনকে বিয়ে করেছেন যার সঙ্গে তিনি শাহরুখের মিল খুঁজে পান, ‘একই ধরনের আবেগ’ বোধ করেন।

এই লেখক জানান, শাহরুখ তার সময়ের একজন আইকন। কিন্তু বলিউডে তার আগমনের পর গত ৩০ বছরে সময় অনেক বদলেছে। এখনকার তরুণীরা খানকে বিয়ে করতে চান না। তারা নিজেরা খান হতে চান। তারা তার মতো স্বাধীনতা এবং সাফল্য অর্জন করতে চান।

সূত্র: বিবিসি