mission71

মিশন একাত্তর

আজকের টপিক মানসিক প্রস্তুতি। দেখুন, দুনিয়ার প্রায় সব কিছুর জন্যই আমাদের লাগে মানসিক প্রস্তুতির। একেবারে আকস্মিক বেপার গুলি আমাদের হতচকিত করে দেয় বৈকি।
সেই ক্লাস ওয়ান থেকে আমাদের শুরু হয় ক্লাস ৫ এর ফাইনাল ও ব্রিত্তি পরিক্ষার। তার পরে চলে যেএসসি এর প্রস্তুতি। দেন এসএসসি, এইচএসসি, ভর্তি কচিং। আর ইউনিভার্সিটি শেষে একটা ভালো জব তথা বিসিএস এর জন্য ও চলে ধুন্ধুমার প্রিপারেশান। আর যারা বাইরে যেতে চান, তারা জানেন এই ইংলিশ শেখার প্রস্তুতি কতটাই বিটকেল যেখানে সারাটা জীবন আমরা কিনা বাংলায় কথা বলে এসেছি। 🙂
তো এই ফ্রিল্যান্সিং প্রফেশনে আসার আগে কেন নেই কারো আগাম প্রস্তুতি? দুই টাকা দিয়ে পাঁচ দিনের কোর্স করে আমরা চলে আসছি হাজার ডলার ইনকামের প্রফেশনে! তো আপনাদের কি একবারও মনে হয়না যেখানে ১৪ বছর পড়াশুনা করে একটা ঢং এর চাকরী আপনার আমার দ্বারা কপালে জোটান গেলো না, সেই আপনি আমি কি করে বিনা প্রিপারেশানে হয়ে যাবো দুনিয়ার সব থেকে চ্যালেঞ্জিং মার্কেট গুলিতে একজন প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সার, কামিয়ে ফেলব হাজার হাজার ডলার? নিজেই জিজ্ঞেস করেন না একবার? আপনার কি প্রস্তুতি বা যোগ্যতা আছে এইখানে টিকে থাকার জন্য?
এবার আসি কি কি বিষয়ে প্রস্তুতি দরকার একজন ফ্রিল্যান্সার এর? দেখুন ইউনিভার্সিটি তে সব থেকে টপ করা ছেলে বা মেয়েটাও কিন্তু চাকরী ক্ষেত্রে গিয়ে অনেক হিমশিম খায় কারণ ফিল্ড পরিবেশে তার কাজের কোন প্রস্তুতি নেই। হয়তো সে দিন রাত এসি রুমে পড়াশুনাই করে টপ করেছে। রোদে পোড়ার দরকার তার লাইফে পরে নাই। বিধায় কর্ম ক্ষেত্রে সে এই আউটপুট দিতে পারছে না।
আবার দেখেন, অনেক টপ করা ছাত্র ছাত্রী বিদেশে গিয়ে সেখানকার কালচার এ মানিয়ে নিতে পারছেন না। ফেস করতে হচ্ছে নানান সামাজিক ঝামেলার সাথে। কিংবা গ্রামের ভালো ছেলে টা শহরে এসে ফাইট করছে শহুরে প্রতিকূলতার সাথে টিকে থাকার জন্য।
এটা বরাবরই আফসোসের জায়গায় থেকে যাবে যে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ফাইট করার বিষয় গুলি অন্তর্ভুক্ত করাই থাকে না। এগুলি আমরা ইভেন জানিও না যে ফেস করতে হবে রিয়াল লাইফে। আর তাই বাইরের পরিবেশ টা আমাদের জন্য এতো প্রতিকূল।
ফ্রিল্যান্সিং এও ব্যাপার টা তেমন। এখানে অনেকে ছাত্র থাকা অবস্থায় চলে আসছেন নিজের হাত জোগানোর জন্য, কেউ বা জব এর পাশা পাশি করতে এসেছেন বারতি ইনকামের ধান্দা। কেউ কেউ কোথাও নিজেকে যোগ্য প্রমান না করতে পেরে এসেছেন এই মার্কেটে নিজের জায়গা করে নিতে কারণ এখানে কোন জব ইন্টারভিউ দিতে হয়না। তাই এখানে নিজের আইডি খোলা টা ভীষণ সহজ। আর তার ওপর সস্তা ধান্দাবাজ দের ইনফ্লুয়েন্স তো আছেই। 🙂
কিন্তু কেউ একটা বেপার বুঝতে পারছেন না যে এটা একটা বিজনেস যেখানে আপনার সম্পূর্ণ টা দিয়ে ট্রাই করে লেগে থাকতে হবে আর তবেই আপনি হয়তো… জি হয়তো সফল হতে পারবেন তাও এখানে সফলতার সংজ্ঞা নেই। দুই বছর পরে প্রপার প্ল্যান না থাকলে বেকার হতে আপনার বেশি সময় লাগবে না।
১। ফ্রিল্যান্সিং এ আপনাকে এখন ফুল টাইম কাজ করার চিন্তা করেই নামতে হবে কারণ আগের দিন আর নেই। এখানে দিনে ২-৩ ঘন্টা সময় দিবো, তার পরে মাসে ৫০০ ডলার ইনকাম করবো, ওহ সেই গোল্ডেন দিন ৭-৮ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে! এখন এখানে আপনি অফলাইন হবেন তো আরেকজন আপনার কাজ বাগিয়ে নিয়ে যাবেন আর মার্কেট ও আপনাকে নামিয়ে আনবে নিচে। কাজেই এই রকম মানসিক প্রস্তুতি আপনার থাকতে হবে।
২। এখানে রাত জাগতে হয়। আসলে অনেকেই প্রশ্ন করেন ফ্রিল্যান্সিং করলে কি রাত জাগতে হয়? জি হয়। জদিও আমি এটা এলাও করিনা। কিন্তু শুরুর দিকে আপনাকে দিন রাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। এখানে যেহেতু আমরা বাইরের দেশের ক্লায়েন্ট দের কাজ করি, তাই একটা নির্দিষ্ট বায়ার বেইজ তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনাকে দিন রাত সব মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তবে তার মানে এই না যে নাইট গার্ড এর মতো রাতে কাজ করবেন আর দিনে ঘুমবেন! এখানে দিন রাত মিলে করা কষ্ট আপনাকে তার ফল এনে দেবে।
৩। বাংলাদেশে, পড়াশুনা, অধিকাংশ চাকরী বাকরি কোন খানেই যেটা দরকার পরে না, সেই প্র্যাক্টিকাল ইংলিশ এর দরকার পড়বে এই সেক্টরে কারণ এখানে আপনার সুন্দর চেহারা বা কোকিল কণ্ঠের তেমন কোন দাম থাকবে না জদিনা আপনি ভালো ইংরেজি বুঝতে ও বলতে না পারেন। তবে অনেকেই ইদানীং দেখছি, মার্কেটিং করছেন, ইংরেজি না জেনেও ফ্রিল্যান্সিং করা যায় ও তাকে আমি ফ্রিল্যান্সিং ই বলবো না! কারণ সেটা করে হয়তো টু পাইস কামিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু সেটা ক্যারিয়ার এর অংশ হিসেবে যুক্ত করতে পারবেন না কোন দিনও। 🙂
৪। ফ্রিল্যান্সিং কে এখনো অনেক নির্বোধ ফ্রিল্যান্সিং হিসেবেই আখ্যায়িত করেন যা কিনা মুক্ত বা স্বাধীন পেশা নামে পরিচিত। দাঁড়ান, এখানে একটু হাসির বিরতি নেই!…… হাহাহাহা, হাহাহা, হাহাহাহা
তো, ভাই সব। হাসি শেষে আবার হাজির হলাম আপনাদের মাঝে আমি সুলতান নীর। 😛
এখন নতুন ফ্রিল্যান্সার দের যে চাপ, এই চাপ হয়তো আর কারো ই নেই। যেমন মানসিক, তেমনি শারীরিক। নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করবো, না মন চাইলে করবো না, এই থিয়োরি এখন আর খাটে না। এখানে আপনাকে এক মিনিট দেরিতে মেসেজ এর রিপ্লে দিলে মার্কেট সবার নিচে ফেলে দিবে। রিসার্চ না করলে কেউ আপনাকে খুজে পাবে না। সময় মতো কাজ জমা না দিলে পরবর্তী কাজের আশা বাদ দেন আপনি! আর যদি ছুটি নিছেন দুই দিনের জন্য, তাহলে নতুন জব খোঁজা ছাড়া আপনার কোন উপায় নেই। 😛 কারণ এই আইডি তে তো আপনি পারমানেন্টলি ভ্যানিশ ই থাকবেন ক্লায়েন্ট দের কাছে লোল। কাজেই এই চিন্তা থেকে কেউ এখানে আসবেন না যে খাই দাই ইচ্ছা হইলে কাম করি আর টাকা কামাই। এই দিন আর নাই।
৫। আপডেট করার মেন্টালিটি আমাদের অনেকের মধ্যেই নাই। এমনকি খুব কম মানুষ কে দেখি জব করতে করতে হায়ার ইডুকেশান এনরোল করেন। ডিগ্রি নেন, নিজেকে আপডেট করেন। আজ আপনি ফ্রিল্যান্সার তো নিজেকে, নিজের কাজ কে, নিজের দক্ষতাকে এবং নিজের গেজেট কে আপডেট করার কোন বিকল্প নেই। এখানে একাধারে আপনাকে হতে হবে একজন ডিজাইনার, ডেভেলপার, মার্কেটার, প্রেজেন্টার, অ্যাডমিন বস এবং এমপ্লই। 😛 প্রতিনিয়ত নিজেকে আপডেট, আপগ্রেড করতে হবে কাজের প্রেক্ষিতে। অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে! সেই সাথে হতে হবে সামাজিক। তৈরি করতে হবে ব্যাকাপ প্ল্যান। সব মিলিয়ে মুখ বুঝে শামুকের মতো স্লো মানুষদের জন্য এই পেশা নয়।
বলতে চাইলে আরও ১০ টা টপিক বলা যেতো কিন্তু আপনারা আইলসা। অত পড়বেন না তাই মেজর কিছু প্রিপারেশান এর আভাস দিয়ে গেলাম। এই জিনিস গুলি যদি আপনি আগে ভাগে জেনে সেই মতো মানসিক ভাবে নিজেকে তৈরি করে নিতে না পারেন। তবে আপনি নিজেকে অন্তত ধরা খাওয়ার জন্য তৈরি করুন।
দেখুন, ফ্রিল্যান্সিং অনেক চ্যালেঞ্জিং একটা পেশা বৈকি আধুনিক জুগে! এটার উপার্জন এবং কাজের ফ্ল যেমন অনেক বেশি, তেমনি কম্পিটিশান ও অনেক বেশি। এখানে লেগে থাকতে হবে। নানান স্ট্রাটেজি শিখে যেতে হবে রেগুলার। তা এপ্লাই করে যদি মন মতো কাজ না হয়, তাহলে নতুন স্ট্রাটেজি আপ্লাই করতে হবে। আর তা করে যেতে হবে আপনাকে! পাশা পাশি অপরের এই ৫ টা বিষয় তো আছেই। সুতরাং আপনি আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আপনি কি আসলেই এই পেশার জন্য তৈরি মানসিক ও শারীরিক ভাবে? যদি হন, তাহলে আপনাকে আমাদের কমিউনিটিতে স্বাগতম।

লেখক : সুলতান নীর