mission71

কিশোরগঞ্জে গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় বরইতলা গণহত্যা দিবসে শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। বুধবার (১৩ অক্টোবর) সকালে এ বিশেষ দিনটি উপলক্ষে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বৃন্দ, আওয়ামী লীগ ও শহীদ পরিবারের স্বজনরা শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, কর্শা-কড়িয়াইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: বদর উদ্দিন, যশোদল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল হক বাবুল, কর্শা-কড়িয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: শহিদুল্লাহ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ’সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও শহীদ পরিবারের স্বজনেরা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ বেধির সামনে শহীদদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত আয়োজন করা হয়।

কিশোরগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর বিভীষিকাময় অধ্যায়ের নাম ‘বরইতলা গণহত্যা’। শহরতলির যশোদল ইউনিয়নের বরইতলা এলাকায় একাত্তরের ১৩ অক্টোবর হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে একসঙ্গে ৩৬৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হানাদার বাহিনী হত্যা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে এতগুলো গ্রামবাসীকে একসঙ্গে হত্যা করার ঘটনা বিরল। সেদিন হত্যা করা হয়েছিল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের ৮ স্বজনকেও। পরবর্তী সময়ে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ওই বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধসহ শহীদদের নামফলক সংবলিত একটি সুউচ্চ কলাম স্থাপন করা হয়। তবে সেখানে মাত্র ১০১ জনের নাম অঙ্কিত করা সম্ভব হয়েছে। এতবছর পর অনেক শহীদেরই স্বজনদের খুঁজে বের করে শহীদদের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে যাদের নাম সংগ্রহ করা গেছে, কেবল তাদের নামই ওই ফলকে স্থান পেয়েছে। এছাড়া আরো তিনজন অজ্ঞাত শহীদের লাশ গলিত অবস্থায় বধ্যভূমিতে পড়ে থাকায় এলাকাবাসী এগুলি সেখানেই দাফন করেছিলেন। প্রতি বছর এই দিবসে বিভিন্ন সংগঠন স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। কি ঘটেছিল সেদিন : পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কিশোরগঞ্জে পদার্পন করে একাত্তরের ১৯ এপ্রিল। শহরের জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, রেলওয়ে ডাকবাংলো, সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, ইসলামিয়া ছাত্রাবাসসহ বিভিন্ন জায়াগায় তারা ক্যাম্প স্থাপন করে। তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করে পাকিস্তান নেজামে ইসলামী পার্টির তৎকালীন সভাপতি মাওলানা আতহার আলী ও পিডিপি নেতা মাওলানা মুসলেহ উদ্দিনসহ তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। পরবর্তীতে উপজেলা পর্যায়েও হানাদাররা ছড়িয়ে পড়ে। গড়ে তোলে রাজাকার, আলবদর ও আলসামস বাহিনী। জেলা শহরের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে হানাদাররা স্থানীয় দোসরদের নিয়ে আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে জ্বালাও-পোড়াও লুটপাট, হত্যাযজ্ঞ ও নারী নির্যাতন চালাত। একাত্তরের ১৩ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে বিশেষ ট্রেন নিয়ে হানাদারার কিশোরগঞ্জ শহরের প্রায় ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের গ্রামের পাশে বরইতলায় যায়। সেখানে পার্শ্ববর্তী দামপাড়া, বীরদামপাড়া, চিকনিরচর, কালিকাবাড়ি, তিলকনাথপুর, গোবিন্দপুর, ভুবিরচর, কড়িয়াইলসহ কয়েক গ্রামের প্রায় ৪শ’ মানুষকে স্থানীয় রাজাকাররা ভয়ভীতি দেখিয়ে জড়ো করে রেখেছিল হানাদারদের সংবর্ধিত করার জন্য। হানাদাররা ট্রেন থেকে নেমে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে নির্বিচার লুটতরাজ আর অগ্নিসংযোগ শুরু করে। বিকাল বেলায় যখন তারা পাশবিক উল্লাস সম্পন্ন করে বরইতলায় ফিরে আসে, তখন স্থানীয় রাজাকার হাসেম রটিয়ে দেয় যে, একজন পাকিস্তানি সেনাকে পাওয়া যাচ্ছে না, গ্রামবাসী তাকে গুম করে ফেলেছে। এই বার্তা পেয়েই সেখানে জড়ো করা শত শত নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর পাশবিক উন্মত্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী। সবাইকে কাতারবন্দী করে দাঁড় করিয়ে কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ব্রাশ ফায়ার বেয়নেট চার্জ আর ভারী দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। লাশের স্তুপের ভেতর কেউ কেউ আহত হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থেকে পরবর্তীতে রক্ষা পান। এসব লাশের কিছু কিছু স্বজনরা নিয়ে দাফন করলেও অনেকগুলোই পার্শ্ববর্তী নরসুন্দার স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তবে অনেকেই পার্শ্ববর্তী শহীদনগর জামে মসজিদে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে রক্ষা পান বলে বর্তমান ইমাম আজিজুল হক জানিয়েছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর : স্বাধীন দেশে ফেরার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম বধ্যভূমিসহ আশপাশের এলাকার নামকরণ করেন ‘শহীদনগর’। বধ্যভূমির লাগোয়া শহীদনগর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন (৬০) জানান, তিনি ও তার চাচাত ভাই খালেক মাস্টার সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন ১১ নম্বর সেক্টরে কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে যাবার অপরাধে স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় হানাদাররা তাদের বাড়িঘরও পুড়িয়ে দিয়েছিল। তবে পরিবারের লোকজন বাড়িতে ছেড়ে আত্মগোপনে থাকায় প্রাণে প্রাণে বেঁচে যান। শেরপুরের নালিতাবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। পরে জানতে পারেন, ১৩ অক্টোবর গণহত্যার সময় পার্শ্ববর্তী দামপাড়া গ্রামের তার নানা আব্দুল হাই, মামা আব্দুল জলিল ও ফজর আলী এবং মামাত ভাই আসাদকেও সেদিন হত্যা করা হয়। সেদিন গুলিবিদ্ধ আরো ৫ জন আত্মীয় পরবর্তীতে ভুগতে ভুগতে মারা গেছেন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা : কিশোরগঞ্জ শহরের আজিমুদ্দিন হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আজিজুল হক জানান, সেদিন তার চাচা তৈয়ব আলী ও হোসেন আলী, ঘটনার ৬ দিন আগে বিয়ে করা চাচাত ভাই সামছুল হককেও সেদিন হত্যা করা হয়। তখনও সামছুল হকের হাতে কাঁচা মেহেদির রং। এলাকার অনেকেই জানান, স্থানীয় কুখ্যাত রাজাকার কলেজ শিক্ষক মাহতাব উদ্দিন, হাসেম আর কালাচাঁনসহ স্থানীয় দোসরদের ইন্দন আর সহায়তায়ই এতগুলো নিরীহ গ্রামবাসীকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল। মাহতাব উদ্দিন মারা গেলেও হাসেম আর কালাচাঁন এখনো জীবিত। কিন্তু গোষ্ঠীগত দাপটের কারণে তাদের বিরুদ্ধে আজো কেউ যুদ্ধাপরাধের মামলা করতে সাহস করেননি। শহীদদের স্বজনরা তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থাকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন।