mission71

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কখনো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে মিলিত হওয়ার বা কথা বলার সুযোগ হয়নি। ম্যান্ডেলা-বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুইজন হলেও দুইজনের বেড়ে উঠা থেকে শুরু করে রাজনীতির উত্থান, আদর্শ, জেল-জুলুম সবকিছুতেই অসাধারণ মিল ছিলো।

১৯৬২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নেলসন ম্যান্ডেলা জেলে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসামান্য নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে উদ্ভুদ্ধ করে একটি দেশ স্বাধীন করা এসব কিছুই আফ্রিকার ভয়ংকর জেলে থাকা নেলসন ম্যান্ডেলা’র কাছে পৌঁছেছে। হয়তো নেলসন ম্যান্ডেলা জেলজীবনে থেকে বঙ্গবন্ধুর লড়াই আর সংগ্রামের কোন একটা বার্তা পেয়েছিলেন, তাই যার সাথে কোনদিন দেখা হয়নি, তার কীর্তি আজীবন মনে রেখেছেন!

অদ্ভূতভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব, কর্মকান্ড, আদর্শ সবকিছু জানতেন, শ্রদ্ধা করতেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নিয়েও আফসোস ছিল তার! এমন অসাধারণ তথ্য পাওয়া যায়, যুক্তরাজ্য প্রবাসী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব, ওয়েষ্টমিনিষ্টার সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলার মরহুম মুশতাক কোরেশীর ‘আমার প্রবাস জীবন ও রাজনীতি’ বইয়ে।
মুশতাক কোরেশী তার আত্মজীবনী বইয়ে লিখেন, ১৯৯৬ সালে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে নেলসন মেন্ডেলা যুক্তরাজ্য সফরে আসেন। ওই বছরের ৯ জুলাই এই বিশ্ব নেতাকে বাকিংহাম প্যালেসে সংবর্ধনা দেয়া হবে এবং এটি ওয়েষ্টমিনিষ্টার কাউন্সিলের আওতায়, সেহেতু তাকে এই কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সর্বাগ্রে সংবর্ধনা দেয়া হবে। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মানপত্র পাঠের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমাকে। ল-নে সাউথ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে আমি সপরিবারে অংশ নিয়েছি। একবার অনশন ধর্মঘট করার সময় আমাকে গ্রেফতারও করা হয়। সেই সুবাদে আমাকে মানপত্র পাঠ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

মুশতাক কোরেশী অনুষ্ঠানের দিনের সম্পর্কে লিখেন, আমার তখন আনন্দ ধরছে না, কারণ আমি নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে শুধু কথা বলা নয়, তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও অংশ নিচ্ছি। আহারের পরে বাড়ি ফেরার পালা। কিন্ত আমাদের চুপি-চুপি বলা হলো, রাষ্ট্রীয় অতিথি যতক্ষণ পর্যন্ত ভোজনকক্ষ ত্যাগ না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত কোনও অতিথিকেই যেতে দেওয়ার নিয়ম নেই। আমরা আরেকটি কক্ষে গিয়ে বসলাম। সেখানে নানা রকম পানীয়, ধূমপানের ব্যবস্থা ছিলো। আমি একটি সিগার ধরিয়ে আয়েশ করে টানছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই একজন ফুটম্যান এসে আমাকে বললেন, ‘কাউন্সিলর দি প্রেসিডেন্ট ওয়ান্টস টু সি ইউ।’ আমি প্রায় লাফিয়ে দাঁড়ালাম এবং যন্ত্রের মতো তাকে অনুসরণ করলাম। আমরা ওই রুমে ঢোকার আগে সেখান থেকে আরও অতিথি বেরিয়ে এলেন, বুঝলাম তিনি পালা করে সবার সঙ্গে দেখা করছেন। আমি যাওয়ার পরে আমার সঙ্গে আবার হাত মিলিয়ে বসতে বললেন। লন্ডনে অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলেছি কিন্ত বাকিংহাম প্যালেসে বসে নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে কথা বলার কখনো সুযোগ হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। নেলসন ম্যান্ডলা আমার কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে এটা-সেটা প্রশ্ন করলেন। আমি যথাসাধ্য উত্তর দিলাম। বুঝতে পারলাম যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বেশ ওয়াকিবহাল। হঠাৎ তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান একজন অত্যন্ত উঁচুদরের নেতা ছিলেন। পাকিস্তানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি অনেক জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তোমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। তোমাদের দুর্ভাগ্য যে, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।’ তার কথাগুলো শুনে আমি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে যাই এবং আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। বুঝতে পারছিলাম যে, আমাকে তিনি অনেকক্ষণ সময় দিয়েছেন। আমার ওঠা উচিত। তিনি আবার আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। আমি বেরিয়ে এলাম, এবং সম্ভবত আমিই প্রথম বাঙালি যার সৌভাগ্য হয়েছিল নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তার বৈদগ্ধ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল কিন্তু বিস্মিত হইনি, কারণ তার মতো বর্তমান সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানাটাই স্বাভাবিক কিন্তু এতোটা যে জানেন, তা জানতে পারলাম তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর।

নেলসন ম্যান্ডেলা এই ঘটনার ঠিক ৯ মাস পর, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের ২৫তম জন্মবার্ষিকীতে আয়োজিত স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী অনুষ্ঠানে, শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফরে যান। ১৯৯৭ সালে ২৬ মার্চের সেই অনুষ্ঠানেও তিনি তার বক্তব্যে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিলেন বাংলাদেশের জাতির জনক, উপমহাদেশের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার গভীর শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি! আমি আজ এই মহান দেশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাই!’