mission71

মিশন একাত্তর

এম আবির হাসান ইবনে হাবিব :আজ লালন ফকির এর জন্মদিন। বাউল জীবনধারার প্রাণপুরুষ, আধ্যাত্মিক সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক এবং অসংখ্য বাউল গানের স্রষ্টা, ফকির লালন সাঁই এর জীবন সম্পর্কে কোন বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। এমনকি, তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে এযাবতকালে সঠিক কোন তথ্যও পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ মনে করেন যে তাঁর জন্ম ১৭৭২ সালের ১৪ অক্টোবর, আবার অধিকাংশ গবেষকই মনে করেন যে তাঁর জন্ম ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর।

লালনের জন্ম আসলে কোথায় তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক । অনেক গবেষক মনে করেন লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালি থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। আবার এই মতের ভিন্নতা আনেন অনেকেই। তাদের মতে, ছেঁউড়িয়া থেকে ২০ কি.মি. দুরের একটা গ্রাম থেকে ১৫/১৬ বছরের একটা ছেলে হারিয়ে যায় আর তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে তাঁর আত্মীয় স্বজন বা পরিচিতরা কেউ চিনতে পারে না, একথা বিস্ময়করভাবে অযৌক্তিক। আবার লালন ফকিরের অন্যতম প্রবীণ ভক্ত পাঞ্জুশাহের ছেলে রফিউদ্দিন তার ভাবসঙ্গীত নামের গ্রন্থে লালন ফকিরের জন্ম সম্পর্কে বলতে গিয়ে ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ড থানার হরিশপুর গ্রামে বলে জানান। এছাড়া ১৩৪৮ সালের মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যায় লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামের একটি মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। লালন হিন্দু না মুসলমান এনিয়ে বিস্তর মতভেদ। কারো মতে লালন কায়স্ত পরিবারের সন্তান যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী, পরে লালন ধর্ম পরিবর্তন করেন। গবেষকদের একাংশ মনে করেন লালন মুসলিম তন্তুবায় পরিবারের সন্তান। পিতা দরিবুল্লাহ দেওয়ান, মাতার নাম আমিনা খাতুন।

মূলত লালনকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করে গবেষকরা নানান সময়ে হিন্দু বা মুসলমান বানানোর চেষ্টা করেছেন। লালন ফকির হিন্দু না মুসলমান এই কৌতূহল ও প্রশ্নের মুখোমুখি লালনকেই হতে হয়েছে তাঁরই জীবদ্দশায়। মোদ্দাকথায়, তাঁর জন্ম ও ধর্ম সম্পর্কে আজো পর্যন্ত কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয়নি। তবে, তাঁর নামের বিষয়ে কিছু সুত্রে জানা যায় যে, প্রিয়জনেরা তাকে ‘নালন’ নামে ডাকতেন। নাল অর্থ উর্বর কৃষিজমি।
লালনের জীবন রহস্য নিয়ে যথার্থ উপসংহারটি টানে, তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতকরী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধ – সেখানে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশত: কিছুই বলিতে পারে না।”
লালন ফকিরের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তাঁর রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি মানবতাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সকল ধর্মের লোকের সাথেই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের সাথে সুসম্পর্কের কারনে অনেকে তাকে মুসলমান বলে মনে করত। আবার কখনো বৈষ্ণবধর্মের মত পোষণ করতে দেখে হিন্দুরা তাঁকে বৈষ্ণব মনে করতো। প্রকৃতপক্ষে লালন ফকির কোন জাতিভেদ মানতেন না। তবে তিনি শ্রীকৃষ্ণের অবতার বিশ্বাস করতেন বলে কারও কারও কাছে জানা যায়। আর আল্লাহ, রসুলের কথা তাঁর অনেক গানেই পাওয়া যায়।

‘হিতকরী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ নিবন্ধে আছে, লালন ফকির যৌবনকালে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন সাথীরা তাঁকে পরিত্যাগ করে যার যার গন্তব্যে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামের সাধক মলম শাহ। মলম শাহ ও তদীয় স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এরপর লালন মলম শাহের কাছে প্রাথমিক দীক্ষা পান ও ছেঁউড়িয়াতে বসবাস করতে থাকেন। একসময় তিনি বিবাহ করেন এবং সামান্য কিছু জমি ও ঘরবাড়ি নিয়ে সংসার করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক গুণাবলী গোপন থাকেনি এবং এই কারনে অনেক শিষ্যও জুটে যায় তাঁর। এসময় লালন তৎকালে বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সংস্পর্শে আসেন ও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন।
এরপর, লালন ফকির ছেঁউড়িয়াতেই একটি আখড়া তৈরি করেন এবং শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতে থাকেন। তার শিষ্যরা তাঁকে ‘সাঁই’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি শীতকালে একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সংগীত, সাধনা ও নানা আধ্যাত্মিক বিষয়ে আলোচনা হত। চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং দূরদূরান্তের অনেক মানুষ লালন ফকিরের শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিলেন তখন – শোনা যায়, তাঁর দশ সহস্রাধিক শিষ্য ছিল।

কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অনেকের সাথেই লালন ফকিরের পরিচয় ছিল বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়। ঠাকুরদের জমিদারিতেই ছিল তাঁর বসবাস এবং ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা ছিলেন তিনি। কিন্তু এই ঠাকুরদের সঙ্গে লালন ফকিরের একবার সংঘর্ষ ঘটে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন সেসময়। এরই একটি সংখ্যায় ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্তে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন ফকির সশস্ত্রভাবে জমিদারের লাঠিয়ালদের মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এর পর থেকে কাঙাল হরিনাথকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন লালন ফকির। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, তখনকার শ্রেণীবিভক্ত সমাজেও লালন ফকির ও তাঁর অনুসারীদের অবস্থান ছিল শোষণের বিরুদ্ধে আর নিপীড়িতের পক্ষে।
লালন ফকিরে জীবদ্দশায় তার একমাত্র স্কেচটি তৈরী করেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালন ফকিরের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তাঁর বোটে বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন, যা কোলকাতার এক জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। অবশ্য অনেকেই দাবী করেন যে, এই স্কেচটিতে লালন ফকিরের আসল চেহারা ফুটে ওঠেনি।
১৮৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর, ফকির লালন সাঁই, ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর দিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত তিনি গানবাজনা করেন এবং এক সময় শিষ্যদের বলেন – “আমি চলিলাম’’। এর কিছুক্ষন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর কোনও সুস্পষ্ট নির্দেশ বা ইচ্ছা না থাকায়, মৃত্যুর পর তাঁর জন্য, হিন্দু বা মুসলিম, কোন ধরনের ধর্মীয় রীতিই পালন করা হয়নি। তবে, তাঁরই এক পুরনো উপদেশ অনুসারে, আখড়ার মধ্যেই একটি ঘরে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর ১২ দিন পর মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক পত্রিকা ‘হিতকরী’তে সর্বপ্রথম তাঁকে “মহাত্মা” হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।

লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক। যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক এই মনোভাব থেকেই তিনি তার গান রচনা করেছেন।[ তার গান ও দর্শন যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ও অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো বহু খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে। তার গানগুলো মূলত বাউল গান হলেও বাউল সম্প্রদায় ছাড়াও যুগে যুগে বহু সঙ্গীতশিল্পীর কণ্ঠে লালনের এই গানসমূহ উচ্চারিত হয়েছে। গান্ধীরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম, তাকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেয়া হয়েছিল।


জীবনী

নন্দলাল বসুর আঁকা লালনের এই কাল্পনিক চিত্রই সাধারণ মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না এই নজরে।।

কেউ মালায় কেউ তসবি গলায়,
তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়।
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়,
জাতের চিহ্ন রয় কার রে।।
— লালন, আত্মতত্ত্ব

এছাড়া লালন সংসারী ছিলেন বলে জানা যায়। তার সামান্য কিছু জমি ও ঘরবাড়ি ছিল। লালন অশ্বারোহণে দক্ষ ছিলেন এবং বৃদ্ধ বয়সে অশ্বারোহণের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে যেতেন।

ধর্ম বিশ্বাস
জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সব দেখি তা না না না।



গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রমও তো গেল না।
— লালন, ধর্মতত্ত্ব
লালনের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, যা তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার মহাত্মা লালন নিবন্ধে প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন, “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।” বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় লালনের জীবদ্দশায় তাকে কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করতেও দেখা যায়নি। লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রবাসী পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, লালনের সকল ধর্মের লোকের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের সাথে তার সুসম্পর্কের কারণে অনেকে তাকে মুসলমান বলে মনে করতেন। আবার বৈষ্ণবধর্মের আলোচনা করতে দেখে হিন্দুরা তাকে বৈষ্ণব মনে করতেন। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবতাবাদী এবং তিনি ধর্ম, জাত, কূল, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি অনুসারে মানুষের ভেদাভেদ বিশ্বাস করতেন না।

বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়।আবার ভিন্ন তথ্যসূত্রে তার জন্ম হিন্দু পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়।

লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন,

“ লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে ”
লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন,

কাঙাল হরিনাথ তাঁকে জানতেন, মীর মশাররফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাঁকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেননি লালনের জাতপরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।

একটি গানে লালনের প্রশ্ন :

এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।

কিছু লালন অনুসারী যেমন মন্টু শাহের মতে, তিনি হিন্দু বা মুসলমান কোনোটিই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ওহেদানিয়াত নামক একটি নতুন ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী। ওহেদানিয়াতের মাঝে বৌদ্ধধর্ম এবং বৈষ্ণব ধর্মের সহজিয়া মতবাদ, সুফিবাদসহ আরও অনেক ধর্মীয় মতবাদ বিদ্যমান। লালনের অনেক অনুসারী লালনের গানসমূহকে এই আধ্যাত্মিক মতবাদের কালাম বলে অভিহিত করে থাকে।

লালনের আখড়া, যেখানে বর্তমানে তাঁর মাজার অবস্থিত
লালন মূলত অসাম্প্রদায়িক ও মানবধর্মে বিশ্বসী ছিলেন।

লালনের আখড়া
লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তার শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তার শিষ্যরা তাকে “সাঁই” বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সংগীত ও আলোচনা হত। চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকিরের শিষ্য ছিলেন; শোনা যায় তাঁর শিষ্যের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের বেশি ছিল।

ঠাকুর পরিবারের সাথে সম্পর্ক

লালনের সমাধি
কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অনেকের সঙ্গে লালনের পরিচয় ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। বিরাহিমপুর পরগনায় ঠাকুর পরিবারের জমিদারিতে ছিল তাঁর বসবাস এবং ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা ছিলেন তিনি। উনিশ শতকের শিক্ষিত সমাজে তাঁর প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতার পেছনে ঠাকুর পরিবার বড় ভূমিকা রাখেন।

কিন্তু এই ঠাকুরদের সঙ্গে লালনের একবার সংঘর্ষ ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়ার কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এরই একটি সংখ্যায় ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টির তদন্তে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের উপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন সশস্ত্রভাবে জমিদারের লাঠিয়ালদের মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এর পর থেকে কাঙাল হরিনাথকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন লালন।

লালনের জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র স্কেচটি তৈরী করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তাঁর বোটে বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন- যা ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যদিও অনেকের দাবী এই স্কেচটিতে লালনের আসল চেহারা ফুটে ওঠেনি।

লালনের গান:


বাংলা ভাষার উইকিসংকলনে এই নিবন্ধ বা অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত মৌলিক রচনা রয়েছে: লালন
লালনের গান লালনগীতি বা লালন সংগীত হিসেবে পরিচিত।[৫৮] লালন তার সমকালীন সমাজের নানান কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বিভেদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে তার রচিত গানে তিনি একই সাথে প্রশ্ন ও উত্তর করার একটি বিশেষ শৈলী অনুসরণ করেছেন। এছাড়া তার অনেক গানে তিনি রূপকের আড়ালেও তার নানান দর্শন উপস্থাপন করেছেন।

গানের জনপ্রিয়তা:
সমগ্র বিশ্বে,বিশেষ করে বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে লালনের গান বেশ জনপ্রিয়। শ্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার করা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়” গানটির অবস্থান ১৪তম।[৫৯] আত্মতত্ত্ব,দেহতত্ত্ব,গুরু বা মুর্শিদতত্ত্ব, প্রেম-ভক্তিতত্ত্ব,সাধনতত্ব,মানুষ-পরমতত্ত্ব, আল্লাহ্-নবীতত্ত্ব, কৃষ্ণ-গৌরতত্ত্ব এবং আরও বিভিন্ন বিষয়ে লালনের গান রয়েছে। লালনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গানঃ

আমি অপার হয়ে বসে আছি
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
জাত গেলো জাত গেলো বলে
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
আপন ঘরের খবর লে না
আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী
মন তুই করলি একি ইতরপনা
এই মানুষে সেই মানুষ আছে
যেখানে সাঁইর বারামখানা
বাড়ির কাছে আরশিনগর
আমার আপন খবর আপনার হয় না
দেখ না মন,ঝকমারি এই দুনিয়াদারী
ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে
সব সৃষ্টি করলো যে জন
সময় গেলে সাধন হবে না
আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে
তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে
এসব দেখি কানার হাট বাজার
মিলন হবে কত দিনে
কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা

ফরিদা পারভিন উপমহাদেশের সেরা লালন সঙ্গীত শিল্পীদের একজন। আনুশেহ আনাদিল, অরূপ রাহী, ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মশিউর রহমান রিংকু জনপ্রিয় লালন সঙ্গীত শিল্পী। লালনের মাজারে অসংখ্য বাউল শিল্পী একতারা বাজিয়ে লালন গানের চর্চা করে থাকেন। একতারার সাথে বাউল গান আলাদা মাত্রা যোগ করে।