mission71

মহানবী (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর পবিত্র জন্মও হয়েছে অলৌকিক পন্থায়। তাঁর জন্মে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর স্মরণ সব জাতি, সব যুগে করেছে। কিন্তু কবে এই মহামানব জন্মগ্রহণ করেছেন, তা নিয়ে সব আলোচনা রবিউল আউয়াল মাস ঘিরেই হয়ে থাকে। আজ পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। ইসলামের ইতিহাসে দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। বিশেষত দু’টি কারণে ১২ রবিউল আউয়াল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। প্রথমত, সব ইতিহাসবিদের ঐকমত্য বর্ণনা মতে, এই দিনেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) লক্ষ-কোটি ভক্ত-অনুরক্তকে এতিম বানিয়ে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

★মহানবী (সা.)-এর জন্মের তারিখঃ-

৬৩২ খ্রিস্টাব্দের এ দিনে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। দিনটিকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করে আসছে বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায়। একটা সময় আরবজাহান ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মানুষ হয়ে পড়েছিল বেদিন। তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সর্বত্র দেখা দিয়েছিল অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা।
মারামারি আর হানাহানিতে লিপ্ত ছিল মানুষ। মূর্তিপূজা করত। এ যুগকে বলা হয় ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’। এ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে, তাদের আলোর পথ দেখাতে আল্লাহতায়ালা মুহাম্মদ (সা.)-কে এ পৃথিবীতে পাঠান। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে, ‘মহানবীকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবী সৃষ্টি করতেন না।’ এ কারণে এবং তৎকালীন আরবজাহানের বাস্তবতায় এ দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক বেশি। আর খ্রিস্টীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) ভূমিষ্ঠ হন। তাঁর জন্ম তারিখ ২০ এপ্রিল। আরবি হিজরি সন অনুযায়ী তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, রবিউল আউয়ালের ৮ তারিখ মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন। বেশির ভাগ হাদিসবিশারদ একে বিশুদ্ধ বলেছেন। মহানবী (সা.)-এর জীবনীকারদের মধ্যে ইবনে ইসহাক প্রথম সারির জীবনীকার। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) হাতিবাহিনীর ঘটনার বছর ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড-১, পৃ. ১৫৮)আধুনিক যুগে সিরাত বিষয়ে ‘আর রহিকুল মাকতুম’ নামক গ্রন্থটির বেশ আলোচনা আছে। সেই গ্রন্থে এসেছে : সায়্যিদুল মুরসালিন মক্কায় বনি হাশিমের ঘাঁটিতে সোমবার সকালে ৯ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন, যে বছর হাতির ঘটনা ঘটে। সে বছর পারস্য দেশের বাদশাহ আনু শিরোয়ার ক্ষমতা গ্রহণের ৪০ বছর পূর্ণ হয়। (আর রহিকুল মাকতুম, খণ্ড-১, পৃ. ৪৫)

তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন প্রণেতা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মহানবী (সা.)-এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে আরো কিছু অভিমত উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন : এ বিষয়ে সবাই একমত যে নবী করিম (সা.)-এর জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার দিন হয়েছিল। কিন্তু তারিখ নির্ধারণে চারটি বর্ণনা প্রসিদ্ধ আছে—২, ৮, ১০ ও ১২ রবিউল আউয়াল। এর মধ্যে হাফিজ মুগলতাই (রহ.) ২ তারিখের বর্ণনাকে গ্রহণ করে অন্য বর্ণনাগুলোকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ বর্ণনা হচ্ছে ১২ তারিখের বর্ণনা। ‘তারিখে ইবনে আছির’ গ্রন্থে এ তারিখই গ্রহণ করা হয়েছে। গবেষক মাহমুদ পাশা জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে ৯ তারিখ গ্রহণ করেছেন। এটি সবার মতের বিপরীত ও সূত্রবিহীন উক্তি। যেহেতু চাঁদ উদয়ের স্থান বিভিন্ন, তাই গণনার ওপর এতটুকু বিশ্বাস ও নির্ভরতা জন্মায় না যে তার ওপর ভিত্তি করে সবার বিরোধিতা করা যাবে। [মুফতি মুহাম্মদ শফি (করাচি) : সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ১৭]

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দিন হিসেবে সোমবার সম্পর্কে কোনো মতভেদ নেই। কারণ জীবনচরিতকাররা একমত যে রবিউল আউয়াল মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে সোমবার দিন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম। এই সোমবার ৮ অথবা ৯ কিংবা ১২—এটুকুতেই হিসাবের পার্থক্য রয়েছে মাত্র। (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)।

★মিলাদুন্নবী ও সিরাতুন্নবীর মধ্যে পার্থক্যঃ-

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুণ্যময় জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের সোমবারে হয় এ ব্যাপারে সবাই একমত। কিন্তু তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ আলেমের বর্ণনা হলো, যে বছর বাইতুল্লাহর ওপর আসহাবে ফিলের আক্রমণ হয়, সে বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য দিন। এদিনে জগত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাত দিনের বিবর্তনের মূল লক্ষ্য, আদম ও বনী আদমের গৌরব, নুহ আলাইহিস সালামের নৌকার হেফাজতের রহস্য, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দু’আ এবং মুসা ও ইসা আলাইহিস সালামের ভবিষ্যদ্বাণীর জীবন্ত প্রতীক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম এ পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। (সিরাত গ্রন্থ)‘আসহাবে ফিল’ কারা? আসহাবে ফিল হলো, ইয়েমেনের বাদশা আবরাহা হস্তিবাহিনী নিয়ে বায়তুল্লাহ আক্রমণ করেন। তাদেরকে ‘আসহাবে ফিল’ বলা হয়।

মিলাদুন্নবীর অর্থ হলো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের জন্ম আলোচনা। আর সিরাতুন্নবীর অর্থ হলো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী আলোচনা করা। মিলাদুন্নবী ও সিরাতুন্নবীর মধ্যে পার্থক্য হলো এই যে মিলাদুন্নবী পালন করলে তাতে শুধু নবীজীর জন্ম আলোচনা পাওয়া যায়। নবীজীর ৬৩ বছরের আলোচনা পাওয়া যায় না। আর সিরাতুন্নবীর আলোচনা করলে তাতে শুধু জন্ম আলোচনা নয় বরং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের পুরো ৬৩ বছরের আলোচনা পাওয়া যায়। অনেকে না বুঝে নবীর শানে আরো একটি আপত্তিকর কথা বলেন। যারা বলেন মিলাদুন্নবী পালন কর। আর সিরাতুন্নবী বর্জন কর। মিলাদুন্নবী তো পালন করার বিষয় নয়। আর সিরাতুন্নবী পালন করলে অথবা আলোচনা করলে তা উম্মতের জন্য জানারও বিষয়, আলোচনারও বিষয়। নবীকে ভালোবাসা সেটা অনেক দামি কথা। কিন্তু তা যেন অতিরঞ্জিত কিছু না হয়। এদিকে খুব সতর্ক থাকা দরকার। তুমি নবীজীর জন্ম থেকে নবুওয়ত লাভ পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলি ও অবস্থা জানতে পার। নবুওয়ত লাভের সময় হেজায ও সারাবিশ্বের নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা জানতে পার। নবুওয়তপ্রাপ্তি থেকে হিজরত পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলি ও অবস্থা জানতে পার। উল্লেখিত বিষয়গুলো জেনে সে অনুযায়ী আমল কর, তাহলে তুমি খাঁটি উম্মত হতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের রসুলের অনুসরণ ও অনুকরণ করার তৌফিক দান করুক এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন।আমিন।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য
প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ রোগী কল্যাণ সোসাইটি।